যুদ্ধমায়ের বক্ষে ছুরি
যুদ্ধমায়ের বক্ষেছুরি
জেলার প্রান্তের দুই দিকে ইণ্ডিয়ার পাহাড়। দূর থেকে থাকালে মনে হয় সুনামগঞ্জ সীমান্তে বাংলাদেশের পাহাড়। যতই কাছে আসা যাক ততই দেখা যাবে পাহাড় গুলো কেমনা জানি দূরে সরে যাচ্ছে। বছরের চারভাগের ১ ভাগ সময়ই বৃষ্টির আবহ থাকে। দূরের পাহাড়ের মেঘমাল্লার দল ভেসে বেড়ায়। মেঘের অবাধ চলাচল আসমানে নানা রঙের খেলা চলে। মেঘের সীমান্ত নেই,তাই ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়াতে পারে। তাই কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি। ঝিরি ঝিরি বাতাস, ফিনি ফিনি মেঘ আবহাওয়া না ঠাণ্ডা না গরম। প্রকৃতি যেন বিরূপ হয়ে বসে আছে। শহরের একপাশে পাঠাশালা। হাফপ্যান্ট পরিহিত আসাদ এ পথ ধরেই পাঠাশালায় যায়। পথিমধ্যে আসাদ শুনতে পেল, পাকিস্থানি বাহিনী বিভিন্ন জায়গায় আক্রমন করে গ্রাম শহর ও তছনছ করেছে। ছোট শহরে তমতমে অবস্থা বিরাজ করছে। মিলিটারীরা সুনামগঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য আসাদের পাঠশালায় আস্তানা নিয়েছে। আসাদ জানে না শাসকগোষ্টী কী? তাদের কাজ কী? কেনইবা তারা প্রত্যন্ত শহরে রাইফেল ও ভারী অস্ত্র নিয়ে পাহাড়া দিচ্ছে।
আসাদের বয়স ৮/৯ হতে পারে। আসাদ চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। আসাদের ইচ্ছা পড়াশুনা করে মানুষের মত মানুষ হবে। কিন্তু মানুষের মত মানুষ কী তা আসাদ জানে না। সে শুনে আসছে পড়ালেখা করলে মানুষের মত মানুষ হওয়া যায়। আসাদ শান্ত গম্ভীর ছেলে। পড়াই তার একমাত্র কাজ। প্রতিদিন পাড়ার সবাই মিলে স্কুলে যায় দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে আসে। হঠাৎ একদিন বাবা জানিয়ে দিলেন আর স্কুলে যাওয়া যাবেনা। স্কুলে মিলিটারীরা আস্তানা নিয়েছে। আসাদ জিজ্ঞাসা করল বিদ্যালয় তো আমাদের পড়ার জায়গা মিলিটারী থাকবে কেন? ওদের এখানে কাজ কী?
আসাদের স্থায়ী ঠিকানা সুনামগঞ্জ নয়। আসাদের বাবার চাকুরীর সুবাদে ওরা এখানে এসেছে। আসাদের বাবার নাম সাইফুদ্দিন। পাশের জেলাতেই আসাদদের স্থায়ী ঠিকানা। আসাদের বাবা একটি তপশিলি ব্যাংকের ম্যানেজার। ৫বছর হলো টান্সফার নিয়ে সুনামগঞ্জে এসেছেন। সুনাম গঞ্জের প্রকৃতি পথ ঘাট, মাটি হাওর ও নদী খুব ভাল লেগেছে। সুরমার পাড়ে বিকালের মৃদুমন্দ বাতাসে পায়চারী কার না ভাল ভাগে। নদীর পারে সারি সারি নৌকা, দূর দূরান্ত থেকে আসে আবার চলে যায়। মাঝি মাল্লাদের সহজ জীবন দেখতে খুব ভাল লাগে। বিকালে নদী পাড়ে জেলেদের মাছের ব্যবসা খুব জমজমাট। স্বল্প টাকায় প্রতিদিন তিনি মাছ ক্রয় করেন। ট্রান্সফারের পূর্বেই তিনি জেনেছিলেন সুনামগঞ্জের হাওরের মাছ খুব সুস্বাদু। জেলেদের অমায়িক ব্যবহার তাকে আকৃষ্ট করেছে। অনেকদিন টাকা না থাকলে ও ম্যানেজার সাহেবকে ওরা মাছ দেয়। ছোট শহরে মানুষের পারস্পরিক মেলবন্ধন চমৎকার। ধনী গরীব, মুসলিম হিন্দু খৃষ্টান সবাই সবাইকে মান্য করে। সম্প্রীতির এমন মেলবন্ধন তিনি আগে কখনো দেখেননি। মাঝে মধ্যে তিনি ভাবতেন ছেলেমেয়েদের যদি এ অঞ্চল পছন্দ হয় তবে বাকী জীবন এখানেই থাকবেন। পাড়া প্রতিবেশী সবার সাথে সাইফুদ্দিন সাহেবের ভাল সম্পর্ক। প্রতিবেশীর সাথে চলাফেরায় মনে হয় সাইফুদ্দিন সাহেব এ শহরেরই স্থায়ী বাসিন্দা। ব্যাংকের ভাল ম্যানেজার হিসাবে নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। সাইফুদ্দিন সাহেব এ ব্যাংকে আসার পর থেকে ব্যাংকের উন্নতি হচ্ছে। ব্যাংকের ক্লায়েন্ট বৃদ্ধি পেল। টাকার পাশাপাশি সোনাও ব্যাংকে গচ্ছিত রাখতে লোকেরা অব্যস্ত হলো।
মিলিটারিরা শহর ও গ্রামের বিভিন্নস্থানে হত্যাযজ্ঞ করে চারদিকে ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি করেছে। সাইফুদ্দিন সাহেব লোকমুখে শুনতে পেলেন, যে কোন সময় ওরা ব্যাংক লুট করতে পারে। শহরের বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি অফিস প্রায় বন্ধ হয়েছে গেছে। তিনি চিন্তা পড়ে গেলেন কী করবেন। ব্যাংকে এত পরিচিত লোকের টাকা পায়সা সোনা দানা এসবের কী হবে। চোরাগোপ্তা হামলার ভয়ে ব্যাংকের অনেক অফিসার অফিসে আসতে পারেনা। হেড অফিস থেকে খবর আসল ব্যাংক বন্ধ করে সবাইকে নিরাপদে থাকতে হবে। সাইফুদ্দিন সাহেব পরোপকারি লোক, এত লোকের গচ্ছিত আমানতের কী হবে? এই চিন্তায় উনার ঘুম আসে না। শহর ও গ্রামের বিভিন্ন স্থানের শিক্ষিত ও দেশপ্রেমিক লোকদের ধরে নিয়ে হত্যা করছে। এ যেন এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন পরিবারের সবাইকে গ্রামে পাঠিয়ে দিবেন।
বিকালে বাসার বারান্দায় চিন্তাযুক্ত হয়ে বসে আছেন। ব্যাংকের একজন ক্লায়েন্ট আব্দু মিয়া পথ দিয়ে যাচ্ছেন, চিন্তা যুক্ত দেখতে পেয়ে সালাম দিলেন সাইফুদ্দিন সাহেবকে। কিংকর্তব্যবিমূড় সাইফুদ্দিন সাহেবের হঠাৎ টনক নড়ল । জিজ্ঞাসা করলেন ভাই শহরের অবস্থা কেমন? বললেন ভাল না। আমার পরিবারকে কোথায় পাঠাবো ভাবতেছি। আব্দু মিয়া বললেন চিন্তা করবেন না আজ সন্ধ্যার পর আমি আপনাকে জানাচ্ছি, প্রয়োজনে আমাদের গ্রামে আপনাদের সবাইকে নিয়ে যাব। এই বলে চলে গেলেন। সাইফুদ্দিন সাহেবের সময় যাচ্ছে না। ঘরে সুন্দরী বউ এতগুলো ছেলেমেয়ে কোথায়, কিভাবে? এ পরিস্থিতিতে কোথায় নিয়ে যাবেন, ভেবে পাচ্ছেন না।
সাইফুদ্দিন সাহেব ব্যাংকের আমানত সংরক্ষণের জন্য মনস্থির করলেন, যে কোন সময় ব্যাংক লুট হতে পারে। তাই ব্যাংক ভোল্টের চাবি পলিব্যাগে মুড়িয়ে একটি জায়গা চিহ্নিত করে সুরমা নদীতে ফেলে দিলেন। মনে মনে ভাবলেন দেশের স্বাভাবিক অবস্থা হলে ডুব দিয়ে চারি তুলে ব্যাংকের লেনদেন সমাধা করবেন। বিকালে আব্দু মিয়া আসলে তাকে বিস্তারিত জানাবেন। যদি তিনি ফিরে না আসতে পারেন তবে ব্যাংকে সেই তথ্য জানানোর জন্য।
আব্দু মিয়া ঠিক সন্ধ্যার সাথে সাথে গয়নার নৌকা ঠিক করে নিয়ে আসলেন। ম্যানেজার সাহেবকে এসে বললেন, সবাই প্রস্তুতি নেন সন্ধ্যার সাথে সাথে নৌকা করে আপনাদের আমার বাড়িতে নিরাপদে রেখে আসব, গ্রামে মিলিটারিদের আক্রমন নাই বললে চলে।
বিশ্বস্ত আব্দু মিয়ার সাথে পরিবারের সবাই নৌকা করে গ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন। আবছা অন্ধকার, ঝিরি ঝিরি বাতাস বইছে, নদীতে নৌকা অল্প। সবার মনে এক অজানা আতঙ্ক, কখন কী যে হয়। আব্দু মিয়া ও সাইফুদ্দিন সাহেব নৌকার সামনে বসে পর্যবেক্ষণে ব্যস্ত। বুকে কম্পন অনুভূত হচ্ছে, কখন যে বিপদ আসে। রাত ৮.৩০ সময় জয় নগর গ্রামে নসীব উল্লাহ হাজি সাহেবের বাড়িতে পৌছেঁ গেলেন।
নসীব উল্লাহ সাহেব আব্দু মিয়া সাহেবের আপন চাচা। বিশাল দেহী, শুভ্র দাড়িওয়ালা ফর্সালোক। চিহারা সুরতে আফগানী লোক মনে হয়। এলাকায় উনার অনেক সুখ্যাতি আছে। নসীব উল্লাহ সাহেব বিগত ২ মেয়াদের জনপ্রতিনিধি। জনগণবান্ধব, জনদরদী, দানশীল, এলাকার মানুষের যে কোন আপদ বিপদে এগিয়ে আসেন। নতুন মেহমানদের পেয়ে তিনি খুশী। সাইফুদ্দিন সাহেব নসীব উল্লাহ সাহেবের আতিথেয়তায় খুব মুগ্ধ। মনে মনে ভাবলেন ১০/১৫ দিন থাকতে পারলেই হয়তো যুদ্ধ থেমে যাবে, আবার সুনাম গঞ্জ চলে যাবেন। আব্দু মিয়ার উভয়ের সুন্দর ভাব মিলন দেখে ভাল লাগল। চাচাকে বললেন, ম্যানেজার সাহেবকে জোর করে ধরে নিয়ে এসেছি, খুব ব্যক্তিত্বশীল লোক। উনাদের কারো মনে যেন কোন কষ্ট না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে। নসীব উল্লাহ সাহেব আব্দু মিয়াকে আসস্থ করলেন, কোন অসুবিধা হবে না। উনারা আমাদের মেহমান যতদিন চান এখানে নিজের বাড়ি মনে করে থাকতে পারবেন।
বিশাল প্রকাণ্ড বাড়ি। বাড়ির সামনে কল কল বেগে প্রবাহিত সুরমা নদী। বাড়ির পিছনে হাওর, দূরে সীমান্ত পাহাড় ও মেঘমালা। রাতে হাওরের তরঙ্গ ও চাদেঁর আলোর খেলা হাজী সাহেবের চৌছালা টিনের ঘরে আছড়ে পড়ে। বাড়ির চারপাশে হিজল ও করচের ঝোপ, ফলদ, বনজ বৃক্ষে আচ্ছাদিত। প্রকৃতিপ্রেমী যে কোন মানুষকে এ দৃশ্য মুগ্ধ করবে। হাল্কা ভয় ভীতির মধ্য দিয়ে ২ দিন কেটে গেল। গ্রামে শুধু ঐ বাড়িতেই রেডিও আছে। সাইফুদ্দিন ও নসীব উল্লাহ সাহেব খবর শুনেন, কিন্তু যুদ্ধ শেষের কোন খবর নেই। খবরে পাওয়া যাচ্ছে বাঙালিরা গেরিলা যুদ্ধে আধুনিক অস্ত্রের সাথে পাল্লা দিতে পারছেনা। সাইফুদ্দিন সাহেবের উৎকণ্ঠা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে।
বাড়ির প্রত্যেক সদস্যের সাথে আপন আত্মীয়ের মত একটি আন্তরিক পরিবেশ চলছে। চলাফেরা খাওয়া দাওয়া দেখলেই মনে হবে সবাই রক্তসম্পর্কের আত্মীয়। একদিন রাত ১০.৩০ সময় একটি নৌকায় করে ১০/১২ জন পাক সৈন্য নসীব উল্লাহ সাহেবের বাড়িতে আসল। নসীব উল্লাহ সাহেব ভাল উর্দু ও ফার্সি জানতেন। পাক সেনাদের তিনি বুঝাতে সক্ষম হলেন তিনি ও গ্রামের সবাই সাচ্ছা মুসলমান। এই গ্রামে কোন মুক্তিবাহিনী নেই। পাক বাহিনীদের আপ্যায়নের আমন্ত্রণ জানালেন। কিন্তু অন্দর মহলে বিপত্তি দেখা দিল। মহিলারা সবাই ভয়ে কম্পমান। মহিলারা শুনেছেন পাক বাহিনী মেয়েদের ধরে নিতে এসেছে। মহিলারা সবার কাজ ফেলে দিয়ে কেউ কেউ ঘরের কোণে আবার কেউ ভাড়ালে লুকিয়েছেন। সাইফুদ্দিন সাহেবের স্ত্রী ভয় পেয়ে মনে করলেন, পাক বাহিনী উনাদের ধরে নিতে এসেছে। পাক বাহিনী ধরে নিয়ে পুরুষদের গুলি করে মেরে ফেলে দেয় আর নারীদের নির্যাতন করে। তিনি একটি ছুরা হাতে নিয়ে বুকে লাগিয়ে ঘরের কোণে অন্ধকারে বসে রইলেন। মনস্থির করলেন পাক সেনা ধরতে আসলে নিজে নিজেকে হত্যা করবেন। এ ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই।
বাড়ির গৃহকর্তী ভয়ে ভয়ে মেহমানদের খুজঁতেছেন, হঠাৎ সাইফুদ্দিন সাহেবের স্ত্রীর এ অবস্থা দেখে আরো বেশি ভয় পেয়ে গেলেন। বললেন বোন ভয় পেয়োনা আল্লাহ আমাদের রক্ষা করবেন। তিনি বললেন আপনি যান ওরা আমাকে নিতে চাইলে আমি আত্মহত্যা করব। গৃহকর্তী আরো ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি আস্তে আস্তে বিষয়টি নসীব উল্লাহ সাহেবকে বললেন। নসীব উল্লাহ সাহেব চিন্তায় পড়ে গেলেন। কী করবেন বুঝতে পারছেন না। নসীব উল্লাহ সাহেব ছেলেদের একত্রিত করে নৌকায় ৪টি দাঁড়সহ প্রস্তত করতে বললেন। উনার তিন ছেলে ও আব্দু মিয়াদের ২ ভাই দিয়ে ম্যানেজারের পরিবার ও মেয়েদের বাড়ির পিছনের নৌকায় তুলে শ্বশুর বাড়িতে যেতে ইশারায় বললেন। আব্দু মিয়া প্রধান মাঝির ভূমিকা পালন করে সাহসের সহিত সাবাইকে নিয়ে অজানার গন্তব্যে যাত্রা শুরু করলেন। খুব অন্ধকার নিজের চোখ নিজের সাথে বেইমানী করছে কোন কিছু দেখা যাচ্ছে না। অনুমানের উপরেই মাঝ হাওর দিয়ে দাঁড়বেয়ে দ্রুতবেগে নৌকা প্রাবাহিত হতে লাগল। দুই তিন মিনিট পরেই পিছনে থাকান, কেউ আসছে কী না। নৌকার মাঝিরা সবাই জানের ডরে সর্বশক্তি দিয়ে নৌকা চালিয়ে যাচ্ছে। উদ্দেশ্য শুধু মা, বোন ও মেহমানদের নিরাপদ আশ্রয়ে পৌছাঁনো ।
শেখ মো. নজরুল ইসলাম
সহযোগী অধ্যাপক
বাংলা বিভাগ
এমসি কলেজ, সিলেট।